মার্কিন শুল্ক আরোপে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই নির্ভরশীলতার।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই নির্ভরশীলতার। তবে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করায় অঞ্চলটির সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। এতে ঐতিহ্যবাহী মিত্রতার ভিত্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (এমইএনএ) অঞ্চলে কিছু সম্ভাবনা জোরদার হতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও রফতানিতে বৈচিত্র্যায়নের সুযোগ। খবর আরব নিউজ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির অধীনে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশের পাশাপাশি মিসর, মরক্কো, লেবানন ও সুদান থেকে আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। অন্য আরব দেশের মধ্যে সিরিয়া ৪১ শতাংশ, ইরাক ৩৯, লিবিয়া ৩১ ও আলজেরিয়া ৩০ শতাংশ শুল্কের শিকার হচ্ছে। এছাড়া তিউনিসিয়া ও জর্ডান যথাক্রমে ২৮ ও ২০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়েছে।

শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি পণ্যের ওপর আরোপ করা হলেও বেশির ভাগ জিসিসি সদস্যই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে। অর্থাৎ তারা যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির তুলনায় আমদানি বেশি করে। মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত বছর এমইএনএ অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৬ হাজার ১৩০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ বা ১০০ কোটি ডলার কম। ২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৯১০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুল্ক আরোপ শুধু অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন নয়। এটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তার প্রতিফলনও। ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ইনস্টিটিউটের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা তামের আল-সাইয়েদ বলেন, ‘শুল্ক কখনই শুধু কর নয়, একেকটি বার্তা। আর ওয়াশিংটন বলছে, আমরা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সুরক্ষায় প্রাধান্য দিচ্ছি।’

সাম্প্রতিক বার্তা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধরনকে বদলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য তামের আল-সাইয়েদের। দুই অঞ্চলের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে সম্পর্ক দৃঢ় হলেও পেট্রোকেমিক্যাল, অ্যালুমিনিয়াম ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট খাতে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।

শুল্ক শুধু খরচ বাড়ার বিষয় নয়, বরং পুরো সম্পর্কের ভাষা বদলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়ী ও সরকারগুলোর সামনে যে প্রশ্ন আসছে—আমরা কি মার্কিন বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল? ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কীভাবে সুরক্ষিত করা যায়?

রিয়াদের আল-ইয়ামামাহ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইয়াসিন গোলাম জানান, কিছু দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক ও বাণিজ্যের পরিমাণের কারণে প্রভাব বেশি হলেও সরাসরি অর্থনৈতিক আঘাত খুব বড় নয়। ১০ শতাংশ শুল্ক রফতানির পরিমাণে খুব একটা পরিবর্তন আনবে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনীতি ও বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু চীনের মতো উদীয়মান শক্তির কারণে তার আধিপত্য কমছে, যা কাজে লাগাতে পারে মধ্যপ্রাচ্য।

এমইএনএ অঞ্চলে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশ অ্যালুমিনিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের যেকোনো পরিবর্তনে সরাসরি প্রভাবিত হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে। তামের আল-সাইয়েদ বলেন, ‘শুল্কের কারণে আমাদের পণ্যের মূল্যভিত্তিক সুবিধা কমে গেছে। তবে এটি নতুন সুযোগও তৈরি করছে। কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাত লাভবান হতে পারে। কারণ মার্কিন এ খাতের দাম বাড়ায় সরবরাহে পরিবর্তন আসছে।’

দুবাইয়ের জেবেল আলির মতো রি-এক্সপোর্ট হাবগুলো এখন নতুন সরবরাহ চেইন সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা তামের আল-সাইয়েদের। তিনি প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থনীতিকে সম্ভাবনাময় খাত উল্লেখ করে জানান, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এখন স্থিতিশীল ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম অংশীদার খুঁজছে। এক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল।

একসময় জ্বালানি তেলনির্ভর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য এখন অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যায়নে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বৈচিত্র্যায়ন প্রক্রিয়া নতুন না হলেও শুল্ক একে নতুনভাবে গতিশীল করবে। তামের আল-সাইয়েদের মতে, এ নীতি মধ্যপ্রাচ্যে সাধারণ এজেন্ডা হয়ে ওঠায় জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংহতি বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখন ভারসাম্যপূর্ণ, বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে এ অঞ্চলের বাণিজ্য।

বিশেষ করে ‘ভিশন ২০৩০’-এর মতো উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে একক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে কাজ করছে। তামের আল-সাইয়েদ বলেন, ‘শুল্ক শুধু সেই তাগিদকে আরো জোরদার করেছে। এখন আপনি দেখতে পাবেন চীন, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার সঙ্গে আরো দৃঢ় বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে।’

ভবিষ্যতে খাতভিত্তিক ও লক্ষ্যনির্ভর বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইউরোপের সঙ্গে সবুজ জ্বালানি, এশিয়ার সঙ্গে ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আফ্রিকার সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে অংশীদারত্ব তৈরি হতে পারে। তামের আল-সাইয়েদের মতে, এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য শুধু রফতানি-আমদানি নয়। বরং প্রভাব, প্রবেশাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে।

মধ্যপ্রাচ্য এখন যৌথ মালিকানায় প্রযুক্তি উৎপাদন, লজিস্টিকস বা বিরল ধাতু উত্তোলনের মতো নতুন খাতে কাজ করছে। তামের আল-সাইয়েদ বলেন, ‘যদি মধ্যপ্রাচ্য সঠিকভাবে পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তারা শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, হতে পারে বৈশ্বিক সংযোগকারী।’

আরও